প্রিয় সর্দি ভালোবাসার গল্প

Via Other

শীতকাল আসলে আমার একটা কঠোর সমস্যা শুরু হয়। সমস্যাটা হচ্ছে সর্দি। আসলে ঠিল সর্দি না। শীতকাল আসলে আমার নাক দিয়ে অটোমেটিক পিচ্ছিল একপ্রকার তরল পদার্থ পড়তে থাকে। যা চরম মাত্রার বিরক্তিকর। নাহিদার পাশে শুয়ে আছি।
.
আজ নাহিদার মেজাজ গরম। আমাকে কাছে ঘেঁসতে দিচ্ছে না। চুপচাপ শুয়ে আছি শান্ত বাচ্চার মত। কিন্তু বেশিক্ষণ শান্ত থাকতে পারলাম না। নাকের ফুটো দিয়ে সেই বিশ্রী তরল বাইরে চলে আসা মাত্র আমি নাহিদার শাড়ির আচঁল দিয়ে নাক মুছে ফেললাম। নাহিদা কিছু না বলে আমাকে, হালকা করে একটা কিক মারলো।

.
আমি যেই লেভেলের চিকনা ছিলাম, তার সেই হালকা কিক খেয়ে সোজা বিছানা থেকে ফ্লোরে পরলাম। ফ্লোর থেকে উঠে বসে একবার নাহিদার মুখের দিকে তাকালাম। নাহিদা রেগে অগ্নিমূর্তি ধারণ করে বিছানায় বসে আছে। আমি অবস্থা বেগতিক দেখে চুপচাপ আবার বিছানায় ঘাপটি মেরে শুয়ে পড়লাম।
.
দীর্ঘ কয়েক মিনিট আমি টু শব্দ টা পর্যন্ত করিনি। নাহিদা উঠে গিয়ে শাড়ি বদলে নীল রঙের একটা সেলোয়ার কামিজ পড়ে এসেছে। নাহিদা এই পর্যন্ত একটা কথা বলেনি। ওড়না টা বালিশের পাশে রেখে চুপচাপ বালিশের এক পাশে শুয়ে পড়লো। আমার সিঙ্গেল বেডে বালিশ একটা।
.
এই এক বালিশে আমি আর নাহিদা গত তিনদিন ধরে ঘুমোচ্ছি। আমি বলেছিলাম যে, “তোমার বালিশ লাগবে নাহিদা? একটা কিনে আনি? ” নাহিদা শুধু কটমট করে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। আমি তাকে আর দ্বিতীয় বার একি প্রশ্ন করিনি।
.
নাহিদার নিশ্বাসের শব্দ আর আমার শ্বাস নেওয়ার শব্দ ছাড়া ঘরে আর কোনো শব্দ হচ্ছে না। না, ভুল বললাম! টিনের চালে কুয়াশার পানি পড়ার একটা শব্দ হচ্ছে। এছাড়া আর কোনো শব্দ হচ্ছে না। আমার নাকের ডগায় আবার সেই বিশ্রী তরল চলে আসায় আমি বেশ বিরক্ত এবং চিন্তিত।
.
নাকের ডগায় এই তরল আসায় নাকের ফুটোতে চুলকানি মত একটা অনুভূতি হচ্ছে। আমি শেষ রক্ষা করতে না পেরে, নাহিদার ওড়না দিয়ে নাক মুছে সযত্নে ওড়না টা বালিশের পাশে রেখে দিলাম। চোরের মত তার দিকে পাশ ফিরে দেখলাম, নাহিদা আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
.
তার রাগান্বিত চোখ আর মুখের অবস্থা দেখে আমি তৈরি হয়ে নিলাম আরেকটা কিক খাওয়ার জন্য। নাহিদা এখন আর কিছু করলো না। ওড়না টা ছুড়ে ফেলে দিল মেঝেতে। তারপর আবার বালিশে চুপ করে শুয়ে পড়লো। আমি ও অপরাধীর মত নাহিদার পাশে শুয়ে পড়লাম।
.
কিন্তু হতচ্ছাড়া সর্দি, সে আমাকে শান্তিতে থাকতে দিলনা। ঘর কাঁপিয়ে একটা হাঁচি দিতে’ই নাহিদা উঠে বিছানায় বসে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো। আমি কাচুমাচু হয়ে তার সামনে পড়ে রইলাম। ঠিক সেই মূহুর্তে আরেকটা হাঁচি দিলাম। আর যেটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর তম হাঁচি।
.
হাঁচি দেওয়ার সাথে সাথে আমার নাক থেকে একদলা সাদা জল রঙের পিচ্ছিল তরল নাহিদার গায়ে থাকা নীল রঙের জামা টা ভর্তি করে দিল। নাহিদা এবার আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারলো না। কান্নাকাটি শুরু করে দিল। আমি যতবার তার কান্না থামাতে যাই, দু চারটা কিল ঘুষি খেয়ে ফিরে আসি।
.
নিজের কাছে খুব খারাপ লাগছিলো। এত রাতে মেয়েটা শীতের মধ্যে আমার জন্য গিয়ে গোসল করছে। আমি বালিশ নিয়ে মেঝেতে কাঁথা বিছিয়ে শুয়ে পড়লাম। এর প্রধান উদ্দেশ্য এখন আর আমি নাহিদা কে বিরক্ত করব না। মেয়েটা অর্ধেক রাত আমার জন্য ঘুমোতে পারেনি। বাকি রাতটা শান্তিতে ঘুমাবে অন্তত।
.
আমি বাড়তি সেফটি হিসেবে নাহিদার ওড়না টা মেঝে থেকে তুলে নিয়ে হাতের কাছে রাখলাম। এবার হতচ্ছাড়া সর্দি আর ঝামেলা করতে পারবে না। বাথরুমের দরজা খোলার শব্দ শুনে আমি সেদিকে তাকিয়ে দেখলাম নাহিদা গোসল করে বেড়িয়ে এসেছে। মেয়েটা শীতে কাঁপতে শুরু করেছে।
.
আমাকে দেখে তার চোখ দুটো দপ করে জ্বলে উঠলো। যেন চোখ দিয়ে আমাকে হুমকি দিচ্ছে, “ তোমার বারোটা আমি বাজাবো! ” আমি আর দ্বিতীয় বার নাহিদার দিকে তাকানোর সাহস করলাম না। নাহিদা কাঁপতে কাঁপতে বিছানায় পাশে এসে দেখলো, আমি কাঁথা বালিশ সব নিয়ে মেঝেতে পড়ে আছি।
.
যেহেতু নতুন বিয়ে করেছি আমরা, আর বাড়ি থেকে পালিয়ে সেজন্য ঘরে বেশি কিছু নেই। একটা পাতলা কাঁথা একটা বালিশ আর বিছানায় বিছানোর মত একটা তোশক। খাটের উপরে বিছানা বলতে কিছু নেই। আমি সবকিছু নিচে নামিয়ে শুয়ে আছি।
.
নাহিদা এবার অগ্নিমূর্তি হয়ে আমাকে অগ্নিমন্ত্রে বলল, “ তুমি নিচে কি করছো?” আমি নিরীহ গোবেচারা লোকের মত বউয়ের দিকে তাকিয়ে আস্তে করে মিনমিনে স্বরে জবাব দিলাম, “ তোমার আমার সাথে শুতে অসুবিধে হচ্ছে, সেজন্য আমি নিচে চলে এসেছি। তুমি উপরে ঘুমাও। ” আমার কথা শুনে নাহিদার মাথায় যেন আগুন ধরে গেল।
.
চিৎকার করে উঠলো আর তারপর বিকট স্বরে বলল, “ এই শীতের রাতে আমি কাঁথা, বালিশ, তোশক ছাড়া খালি খাটে ঘুমাবো? ” নিজেকে শ’খানিক গালি দিলাম মনে মনে। তারপর সব কিছু খাটের উপরে তোলে বিছনা করে দিলাম নাহিদাকে। নাহিদা এখনো কাঁপছে শীতে।
.
সাদা রঙের পাতলা একটা জামা পড়ে আছে। ধরতে গেলে যার পুরোটা ভিজে গেছে। আমি অপরাধী কণ্ঠে নাহিদাকে বললাম , “ নাহিদা! চা করিয়া দিব কি? চা পান করিলে আর শীত লাগিবে না। ” মাত্রাতিরিক্ত টেনশন করলে আমার মুখ দিয়ে সাধুভাষা বের হয়। আমার কথা শুনে নাহিদা খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো।
.
মাথা কাৎ করে সম্মতি জানিয়ে দিল। তার হাসি দেখে আমার চোখে মুখে খুশি ঝলমল করা শুরু করল। এই মেয়ে এত সুন্দর করে হাসতে পারে যা আমি কল্পনায় দেখতে পারিনা। নাহিদা খিলখিল করে কখন হাসবে তা দেখার জন্য আমি সবসময় তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি।
.
মাঝে মাঝে তাকে লেইম জোক্স শুনাই। আমার জোক্স শুনে নাহিদা হাসে না, আমি যে তাকে হাসানোর জন্য জোক্স বলি সেটা ভেবে সে হাসে। আর আমি সেই হাসির প্রেমে পড়ি। নাহিদাকে বিছানায় বসিয়ে কাঁথা দিয়ে মুড়িয়ে দিলাম। মেয়েটা আমার কান্ড কারখানা দেখে এখন শুধু হেসে চলেছে।
.
আমি একটু পর পর এটা ওটার কথা জিজ্ঞেস করতে তার কাছে আসি। সে হেসে হেসে জবাব দেয় আমার প্রশ্নের। রাত তিনটের সময় ধোঁয়া উঠা দু কাপ চা নিয়ে তার সামনে হাজির হলাম। একটা কাপ বাড়িয়ে দিলাম নাহিদার দিকে।
.
চায়ের কাপ হাত না দিয়ে বলল, “ দুই কাপ কেন? ” আমি একটা কাপ পাশের টি-টেবিলে রেখে অন্য কাপটা নিয়ে নাহিদার দিকে এগিয়ে গেলাম। নাহিদা সরে গিয়ে আমার জন্য জায়গা দিল।
.
কাঁথার নিচে বসে একটা চুমুক দিয়ে ধোঁয়া উঠা কাপের দিকে তাকিয়ে নাহিদা কে বললাম, “ নাহিদা! চা টা খেয়ে দেখো তো? চিনি কম হয়েছে বোধহয়। ” নাহিদা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল, “ কই, চায়ে তো চিনি ঠিক আছে। ”
.
আমি চায়ের কাপটা নিয়ে আবার চুমুক দিয়ে বললাম, “ হুম, এবার চায়ে মিষ্টির পরিমাণ ঠিকঠাক আছে! ” নাহিদা আবার খিলখিল করে হেসে উঠলো। আমার কাধে মাথা রেখে বলল, “ তুমি না, পারো ও বটে! ”
আমি কিছু বলার আগে, হারামজাদা সর্দি নাকের ফুটোতে আক্রমণ করল। সে যেন বলতে চাইছে, আপনার রোমান্সে আমি হাড্ডি হওয়ার জন্য দুঃখিত।